NarayanganjToday

শিরোনাম

আইভীর ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে না.গঞ্জ (১)


আইভীর ছোঁয়ায় বদলে যাচ্ছে না.গঞ্জ (১)

প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জ ইতিহাস ও ঐতিহ্য নির্ভর একটি জেলা হলেও স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত অবহেলিত ছিল এই জেলা শহরটি। যতটা হওয়ার কথা ছিল তার ধারে কাছেও উন্নয়ন হয়নি এখানে।

তবে, ২০১১ সালের পর থেকে শহর, বন্দর ও সিদ্ধিরগঞ্জে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সংঘটিত করে সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। নানা প্রকল্প তিনি হাতে নেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ দশটি প্রকল্প প্রায় শেষপ্রান্তে রয়েছে। ১ হাজার ৮শ ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প দশটি সম্পন্ন করা হচ্ছে। যা নগরীতে দৃশ্যমান। এই পর্বে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি প্রকল্পের হালহকিত তুলে ধরা হলো।

এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে, ৫৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ হতে যাওয়া শহরের ৫নং গুদারাঘাট থেকে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর কদমরসূল সেতু, ৩৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলে কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ এবং অপসারণ, ১৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে শহরের বাবুরাইল খাল খননের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা থেকে ধলেশ্বরী নদী পর্যন্দ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শোভাবর্ধন, ১শ কোটি টাকা ব্যয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীদের জন্য আবাসন নির্মাণ, ১শ কোটি টাকা ব্যয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ খাল (শিমরাইল থেকে ভাঙারপুল পর্যন্ত) পুনঃখনন ও সৌন্দর্যবর্ধন, ১শ কোটি টাকা ব্যয়ে দশ তলা ভিত বিশিষ্ট আধুনিক নগর ভবন নির্মাণ, ৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৬ নং ওয়ার্ডে শেখ রাসেল পার্ক নির্মাণ, ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে সিটি করপোরেশনের আওতায় নারায়ণগঞ্জ, কদমরসুল ও সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলে এলইডি স্ট্রীট লাইট স্থাপন এবং ২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে আলী আহম্মদ সিটি পাঠাগার ও মিলনায়তন নির্মাণ (লেভেল-১ থেকে লেভেল-৬)।

কদমরসূল সেতু

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক সহায়তায় এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা হচ্ছে শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর বহুল কাক্সিক্ষত কদমরসূল সেতু। সেতুটি শহরের পাঁচ নম্বর গুদার ঘাট থেকে শুরু হয়ে বন্দরের সাথে সংযোগ করবে। অনেকেই এই যাবৎ সেতুটি নির্মাণে আশ্বাস দিলেও শেষ পর্যন্ত সেটি আর নির্মাণ কেউই করেনি। সর্বশেষ সিটি করপোরেশন নির্বাচন পূর্বে দুই পাড়ের মানুষের চাহিদা বিবেচনায় ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী কথা দিয়েছিলেন, তিনি নির্বাচিত হলে সেতু নির্মাণ করবেন। তার সেই কথা অনুযায়ে তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই সেতু নির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হন। শেষতক একনেকে সেতু নির্মাণের জন্য অর্থ প্রস্তাব পাশ করা হলে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। করোনার জন্য নির্মাণ কাজ কিছুটা ধীরগতি হয়। তবে, কাজ থেমে নেই। বর্তমানে জমি অধিগ্রহণের কাজ প্রায় শেষান্তে।

সিটি করপোরেশন সূত্র থেকে জানা গেছে, প্রস্তাবিত কদমরসূল সেতুটি একটি সর্বাধুনিক সেতু হিসেবে বিবেচিত হবে, সে লক্ষ্যেই এর কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই সেতুর মধ্যবর্তী সিঙ্গেল স্প্যান হবে ২২০ মিটার যা দেশে নির্মিত সর্বাধিক দৈর্ঘ্যরে একক স্প্যান। এই স্প্যান নির্মাণে ব্যবহৃত হবে স্টীল ও সিমেন্ট, কংক্রিটের কম্পোজিট দ্রব্যসামগ্রী। সর্বোপরী এটি একটি দৃষ্টিনন্দন ক্যাবল স্পেইড সেতু হিসেবে নির্মত হবে।

নাসিক থেকে আরও জানা যায়, ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর কদমরসূল সেতুর জন্য একনেকে অর্থ বরাদ্দ পাশ হয়। এর মোট ব্যয় ধরা হয়েছে, ৫৯০ দশমিক ৭৫ কোটি টাকা। ২০২২ সালের ৩০ জুনের মধ্যে সেতুটি নির্মাণ বাস্তবায়ন সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। এর দৈর্ঘ্য ১৩৮৫ মিটার যার মধ্যে মূল সেতু ৩৮০ মিটার। এর উভয় পার্শে¦ই ফুটপাত রাখা হচ্ছে। 

প্রকল্পটি ২০২০-২১ অর্থ বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচাভুক্ত প্রকল্পসমূহের মধ্যে নিম্ন অগ্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকায় ২০২০-২১ অর্থ বছরে কোন বরাদ্দ প্রদান করা হয়নি, বিধায় প্রকল্প বাস্তবায়ন আরো বিলম্বিত হচ্ছে। অতঃপর ২০২০-২১ অর্থ বছরে অর্থ বরাদ্দ প্রদানের জন্য ২৭-০৭-২০২০ তারিখে স্থানীয় সরকার বিভাগ বরাবর পত্র প্রেরণ করা হয়। ডিজাইন ও প্রাকলন সম্পন্ন করার পর প্রাক-যোগ্যতা (চৎব-ছঁধষরভরপধঃরড়হ) যাচাইপূর্বক ঝযড়ৎঃ খরংঃবফ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নিকট হতে দরপত্র আহবান করা হবে। অতঃপর সর্বনিম্ন দরদাতার প্রস্তাব সরকারী ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটির অনুমোদন গ্রহণ করতঃ কাজ শুরু করতে আরও ৬ (ছয়) মাস সময় প্রয়োজন বলে প্রকল্প পরিচালক জানান।

সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, সেতু নির্মাণ কাজ চলছে। বর্তমানে জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে করোনার কারণে কাজ কিছুটা পিছিয়ে গেছে। যাদের সাথে এটি নির্মাণ চুক্তি হয়েছে করোনার কারণে তারা আসতে পারছে না। তবে, শিগগিরই তারা আসতে পারবেন বলে আশা করছি।

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য স্থায়ী ডাম্পিং গ্রাউন্ড স্থাপন

এদিকে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের জন্য একটি গুরুতর পরিবেশগত  সমস্যা।  নারায়ণগঞ্জ শহর মূলত একটি শিল্প এলাকা। প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে শিল্প বর্জ্য যেমন পলিথিন, কাপড় এবং কাগজপত্র তৈরী হয়। সিটির কঠিন বর্জ্যগুলির প্রধান উপাদানগুলিতে খাদ্য, শাকসবজি, ফল, পলিথিন, কাগজ এবং জুট কাপড় রয়েছে। এইগুলির মধ্যে, মেডিক্যাল বর্জা, খাদ্য ও শাকসবজি বর্জ্য শহরগুলির প্রধান উপাদান। এনসিসি এলাকায় সন্নিবেশিত বর্জ্যগুলি নিম্নলিখিত উপায়ে গৃহহীন বর্জ্য, সিটি বর্জ্যা বাণিজ্যিক ও অ-বিপজ্জন শিল্প বর্জ্য, বিপজ্জনক (বিষাক্ত)শিল্প বর্জ্য, মেডিক্যাল বর্জ্য্য, মানব ও প্রাণী বর্জ্য্য, নির্মাণ বর্জ্য, ভূগস্থ বর্জ্য, প্রভৃতি।

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য স্থায়ী ডাম্পিং গ্রাউন্ড স্থাপনের নিমিত্ত জনগুরুত্ব অনুধাবন করে জালকুড়ি মৌজায় ২৩ দশমিক ২৯ একর জমি অধিগ্রহণের নিমিত্ত ২০১৫ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ৭ জানুয়ারি একনেক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। প্রকল্প বায় ৩৪৫ কোটি ৯১ লক্ষ ৩১ হাজার টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদকাল ০১ জুলাই ২০১৭ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারী অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হওয়ার পর প্রথমে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয় এবং পরবর্তীতে অন্যান্য কার্যক্রম শুরু করা হয়। ৩৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলে কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ এবং অপসারণ প্রকল্পটি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

কদমরসূল অঞ্চলে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

কদমরসূল অঞ্চলে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্প। ২০২০ সালের জানুয়ারী মাসে কদমরসুল অঞ্চলের মধ্যবর্তী ২৫নং ওয়ার্ডে ধামগড় ও লক্ষণখোলা মৌজার নিরিবিলি এলাকায় ৬৯ দশমিক ৮৭ একর জায়গা অধিগ্রহণের প্রস্তাব করে। এ লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন গত ২০২০ সালের ২১ আগস্ট ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কদমরসুল অঞ্চলে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন প্রকল্প’ প্রস্তাব সরকারের অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করে। যার প্রস্তাবিত প্রকল্প ব্যয় ৩০১ কোটি ৩৫ লাখ ২১ হাজার টাকা। একই বছরের ২০ অক্টোবর সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেক সভায় শতভাগ সরকারী ব্যয়ে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। ২০২৩ সালের ৩০ জুনের মধ্যে এর কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, প্রকল্পের কাজের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ ৬৯ দশমিক ৮৭ একর, কার ওয়াশিং সেড নির্মাণ ২২৫০ বর্গমিটার, রাস্তা নির্মাণ কাজ ৫৫০ মিটার, বাউন্ডারী ওয়াল নির্মাণ ২৬০০ মিটার, ভূমি উন্নয়ন ৪৪৬৭৯৪.৬৮ ঘনমিটার, প্রকৌশল সরঞ্জাম ক্রয় ১৬টি তৎমধ্যে স্কিভ স্টিয়ার লোডার ৫টি, চেইন ডোজার (১৯ টন) ১টি, পে-লোডার (২.৫ ঘনমিটার) ২টি, লোবেড (২০-২৫ টন) ১টি, ওয়েব্রিজ (২৫ টন) ১টি, স্ক্যাভেটর (২০-২৫ টন) ১টি, গার্বেজ ট্রাক (৫ টন) ৫টি, মোটর সাইকেল ৬টি, ভ্যান ও ট্রলি ২০০টি এবং সম্পূর্ণ প্রকল্প এলাকায় সড়কবাতি স্থাপন অন্তর্ভুক্ত আছে।

উপরে