NarayanganjToday

শিরোনাম

আইয়ূবের দোষ, দায় এড়াতে পারেন না ইউএনও


আইয়ূবের দোষ, দায় এড়াতে পারেন না ইউএনও

চার তলা বাড়ির মালিক ও হোসেয়ারি ব্যবসায়ী ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ, উপজেলা প্রশাসনের লোকেরা তদন্তে এলে এমনই তথ্য সরবরাহ করেন বহুল বিতর্কিত কাশিপুর আট নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার আইয়ূব আলী। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দরিদ্র, বৃদ্ধ ফরিদকে একশো ব্যাগ খাবার জরিমানা করেন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফা জহুরা।

এদিকে ওই ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক তোলপাড়। ইউএনও ও ইউপি সদস্যকে নিয়ে নানা সমালোচনা চলছে চারদিকে। দাবি উঠেছে, এই দুজনকে শাস্তির আওতায় এনে যথাপোযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের।

যদিও জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ ওই ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শামীম বেপারীকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। ২৬ মে এই কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এছাড়াও বৃদ্ধ ফরিদ উদ্দিনকে উপজেলা প্রশাসন থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তবে, এখনও পর্যন্ত বৃদ্ধ ফরিদ উদ্দিন প্রশাসন থেকে কোনো ধরণের ক্ষতিপূরণ পায়নি। কবে পাবেন সে বিষয়েও নিশ্চিত কোনো ধারণা প্রশাসন থেকে এখনও পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। যদিও স্থানীয় শাহিনূর আলম নামে এক ব্যক্তি ওই ঘটনার পর বৃদ্ধ ফরিদকে ষাট হাজার টাকা দিয়েছেন। তার দাবি, প্রশাসনের অনুরোধে তিনি এই টাকাটা দিয়েছেন। তবে, এটাই কী প্রশাসনের নির্দেশিত ক্ষতিপূরণ কিনা, এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে, স্থানীয়রা বলছেন, আইয়ূব আলী একজন বিতর্কিত ব্যক্তি। তাকে ঘিরে নানা বিতর্ক রয়েছে স্থানীয় পর্যায়ে। একসময় তিনি ছিলেন টানবাজার পতিতা পল্লীর (বিলুপ্ত) দালাল। বর্তমানে বন্ধন পরিবহনের এমডি। ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার প্রভাবে তিনি এই পরিবহন খাতে ঘাঁটি গেড়ে বসেন। সে থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত শ্রমিক ও মারিকের রক্তচুষে কোটি কোটি টাকার মালিক বনেছেন বিতর্কিত এই ব্যক্তি। নিজেকে তিনি আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবেই পরিচয় দিয়ে থাকেন। হয়েছিলেন কাশিপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানও।

সচেতন মহল বলছে, আইয়ূব আলীর ভুল তথ্যের কারণেই সম্মানহানি ঘটেছে বৃদ্ধ ফরিদ উদ্দিনের। এর সম্পূর্ণ দায় তাকেই নিতে হবে। পাশাপাশি শুধু মাত্র একজন ব্যক্তির তথ্যের ওপর নির্ভর করে একজন ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার ঘটনায় কোনো ভাবেই দায় এড়াতে পারেন না ইউএনও আরিফা জহুরা। তিনি এখানে বিচক্ষণতার পরিচয় দেননি বলেই মনে করেন সচেতন মহল। ফলে, বৃদ্ধ ফরিদ উদ্দিন সাহায্য চেয়ে যে হেনস্থার শিকার হয়েছেন, তার জন্য এই দুই ব্যক্তিই দায়ী। তাদেরকে এমন কাণ্ডের জন্য শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

সূত্র বলছে, ফরিদ উদ্দিন কাশিপুর আট নম্বর ওয়ার্ডের নাগবাড়ি শেষ মাথার বাসিন্দা। বাবার রেখে যাওয়া জমির উপর তার ছয় ভাই তিনতলা ভবন করে সেখানে তারা বসবাস করেন। তবে, দরিদ্রতার কারণে ফরিদ সেখানে কোনো পাকা ঘর করতে না পেরে ছাদের উপর টিনসেডের দুটি রুম করে একমাত্র প্রতিবন্ধী ছেলে, কলেজ পড়ুয়া মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন। এরমধ্যে ব্রেন স্ট্রোকও করেছিলেন তিনি। এতে বাম চোখের দৃষ্টি হারানোর পাশাপাশি কথাবার্তাও খুব একটা গুছিয়ে বলতে পারেন না ফরিদ।

একসময় হোসেয়ারি কারখানার কাটিংম্যান ফরিদ বর্তমানে কর্ম অক্ষমপ্রায়। তবে, সেই হোসেয়ারিতেই শ্রমিকদের কাজের তদারকি করে মাসে আট হাজার টাকা বেতন পান। এ দিয়েই চলে তার সংসার, ওষুধসহ যাবতীয়। মেয়ে টিউশন করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন। কিন্তু করোনার কারণে মেয়ের টিউশন বন্ধসহ নানা জটিলতায় পড়ে যান ফরিদ উদ্দিন। সংসারে দেখা দেয় চরম অভাব অনটন। নিয়মিত এফএম শোনা ফরিদ জানতে পারেন জাতীয় পরিষেবা ৩৩৩ নম্বরে কল করলে গোপনে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। সেই আশায় তিনি এই নম্বরে কল করে খাদ্য সহায়তা চেয়েছিলেন। তবে, তার বাড়ির পাশেই বসবাস করা ইউপি সদস্য আইয়ূব আলী এ ঘটনায় তার ওপর চরম ক্ষুব্ধ হোন। কেন তিনি তাকে না জানিয়ে ফোন করেছিলেন। ফলে ক্ষুব্ধ আইয়ূব উপজেলা পরিষদ থেকে তদন্তে আসা লোকদের বলে দিয়েছেন ফরিদ উদ্দিন একজন ব্যবসায়ী এবং চারতলা বাড়ির মালিক।

আইয়ূবের দেওয়া ওই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফা জহুরা হাজির হয়ে ১০০ দরিদ্রকে ত্রাণ দেওয়ার শাস্তি ঘোষণা করেন। নয়তো তিন মাসের কারাভোগ করতে হবে তাকে। কষ্টে আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিলেন তিনি। পরে নিজের স্ত্রীর গহনা বন্ধক রেখে, সুদে ও ধার করে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা যোগার করে ১০০ জনের খাদ্যসামগ্রী কেনেন। ২২ মে সে ত্রাণসামগ্রী ইউএনও আরিফা জহুরা উপস্থিত থেকে সে ত্রাণ বিতরণ করেন।

এদিকে ওই ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে নারায়ণগঞ্জ ছাপিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। প্রশ্নবিদ্ধ হয় উপজেলা প্রশাসন। অনেকে আবার ইউএনও আরিফা জহুরার এমন কাণ্ডকে কাণ্ডজ্ঞানহীন বলে অবিহত করে ব্যাপক সমালোচনা করেন। সাথে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও ফেসবুকে বিভিন্ন কমেন্টে মন্তব্য করেন।

ওই পুরো ঘটনাটির মহানায়ক বিতর্কিত আইয়ূব আলী বলেছেন, আমি প্রথমে কোনো তথ্য দিই নাই। আমার কাছে ইউএনও কিছু জানতে চায়নি। তিনি (ইউএনও) নিজেই মোবাইল কোর্ট নিয়ে চলে আসছে। আমি নিজেও বিব্রত হইছি। ফরিদ উদ্দিনের বাড়ি আমার বাড়ির পাশেই। আমার জানা মতে তিনি স্বচ্ছল ব্যক্তি। চারতলা বাড়ির মালিক। একটি হোসেয়ারি আছে। ওই হোসেয়ারি নিয়ে আমি বিচারও করে দিছিলাম। ইউএনওকে সেটাই বলেছিলাম।

তবে, সচেতন মহল বলছে, পুরো ঘটনাটির জন্য আইয়ূব আলীই দায়ী। তবে, কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারেন না ইউএনও। কেননা, এখানে তিনি বিচক্ষণতার পরিচয় দেননি। শাস্তি ঘোষণার পূর্বে তিনি আরও সময় নিতে পারতেন। আরও ভালোভাবে খোঁজ খবর নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটি না করেই শাস্তি ঘোষণা করে দিয়েছেন। তাদের কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডের জন্য যরাপরনাই হেনস্তার শিকার হোনে বৃদ্ধ ফরিদ। ফলে এই দুজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তবে, ২৬ মে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি কী প্রতিবেদন দেয়, এবং ফরিদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনায় প্রশাসন কী ব্যবস্থা গ্রহণ করে সেটিই এখন দেখার বিষয়।

উপরে