NarayanganjToday

শিরোনাম

এক প্যাকেট খাদ্য চেয়ে একশ প্যাকেট জরিমানা


এক প্যাকেট খাদ্য চেয়ে একশ প্যাকেট জরিমানা

নিজের ঘরে খাবার জুটে না। আধপেটা খেয়ে না খেয়েই দিন কাটে ফরিদের। অথচ সেই তাকেই গুণতে হয়েছে একশ জনের জন্য একশটি প্যাকেট খাদ্য জরিমানা। যার মূল্য ৭০ হাজার টাকা। শনিবার (২২ মে) যখন এই জরিমানার খাদ্যগুলো কাশিপুর আট নম্বর ওয়ার্ড মেম্বারের সহযোগিতায় স্থানীয়রা নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন অসহায়ের মতো সেসব খাবারগুলোর দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়েছিলেন বৃদ্ধ ফরিদ, তার স্ত্রী ও পনের বছরের প্রতিবন্ধি সন্তানটি। কেঁদেছিলেনও তারা। তাদের ওই কান্নায় গণমাধ্যমকর্মীদেরও ভেতরটা নাড়িয়ে দিয়েছিল।

বাড়ি চারতলা। এই বাড়ির মালিকও তিনি। তবে, পুরো বাড়ির অংশিদার তারা ছয় ভাই। তার অংশে কেবল দুটি টিন শেড রুম। কাজে অক্ষম ফরিদের ১৫ বছরের এক প্রতিবন্ধি সন্তানসহ রয়েছে বিয়ের উপযুক্ত এক মেয়ে। স্ত্রীসহ চার জনের সংসার তার। দরিদ্রতা তার নিত্য সঙ্গী। নিজেও স্ট্রোক করেছিলেন। অভাব অনটনের কথা মুখ ফুটে কাউকে বলতেও পারেননি। তবে, সরকারি সহযোগিতা চেয়ে সম্প্রতি তিনি ফোন করেছিলেন জাতীয় পরিষেবা ৩৩৩ নম্বরে। আর এই এক ফোনেই তাকে গুণতে হয়েছে ওই একশ প্যাকেট খাবারের ব্যাগ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ এক সময় একটি হোসেয়ারি কারখানায় কাজ করতেন। বর্তমানে তার বয়স ষাটেরও বেশি। তার স্ত্রী ও প্রতিবেশীরা জানালেন, তিনি তিন বার ব্রেন স্ট্রোকও করেছিলেন। বর্তমানে তিনি অনেকটাই অচল। কর্মক্ষম নন। তেমন একটা কাজকর্মও করতে পারেন না। তবে, যে কারখানাতে তিনি কার্টি মাস্টার ছিলেন সে কারখানাতেই বর্তমানে শ্রমিকদের কাজ তদারকি করে মাসে আট হাজার টাকা পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। এ দিয়েই চলে তার চার জনের সংসার।

তবে, বর্তমান করোনাকালে ফরিদের সংসারে অভাব অনটন দেখা দেয়। কারো কাছে হাত পেতে সাহায্যও চাইতে পারেন না এই বৃদ্ধ। অনেকেই জানেন তাদের চার তলা বাড়ি আছে। লজ্জায় নিজের অভাব অনটনের কথা নিজের মধ্যেই চেপে কোনো রকম দিনাতিপাত করছিলেন তিনি। শেষে আর না পেরে জাতীয় পরিষেবা ৩৩৩ নম্বরে ফোন করে খাদ্য সহায়তা চেয়েছিলেন তিনি। এতেই বাধে যত বিপত্তি। এক প্যাকেট খাদ্য সহায়তা চেয়ে তাকেই উল্টো দিতে হয়েছে একশ প্যাকেট খাদ্য জরিমানা!

সূত্র জানায়, ফরিদ উদ্দিনের কল পেয়ে তার বাড়িতে সরেজমি উপস্থিত হন নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফা জহুরা। তিনি ওই দিন গিয়ে ফরিদ উদ্দিনকে চারতলা বাড়ির মালিক হিসেবে জানতে পারেন। জানতে পারেন তিনি স্বচ্ছল। ফলে খাদ্য সহায়তা চেয়ে ফোন করায় তাকে ওইদিনই ১শ প্যাকেট খাদ্য জরিমানা ধার্য করেন ইউএনও। শনিবার (২২ মে) দুপুরের দিকে ইউএনও উপস্থিত থেকে ফরিদকে ধার্য করা জরিমানার একশ প্যাকেট খাদ্য দরিদ্রদের মাঝে বিলি করেন।

তবে, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কাশীপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নাগবাড়ি শেষ মাথা এলাকার বাসিন্দা ফরিদের এই একশ প্যাকেট খাদ্যের পেছনে রয়েছে করুন গল্প। সবাই জানে ফরিদ চারতলার মালিক। কথা সত্য।

তবে, এলাকাবাসী সূত্র বলছে, এই বাড়িটি চারতলায় দুটি টিনশেড রুম রয়েছে। এই দুটি রুমই তার। ভাইদের সহযোগিতায় এই রুম দুটি করে তিনি স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে এখানে বসবাস করেন। বাকি ফ্ল্যাটগুলো তার ভাইদের। সেসব অংশে তার কোনো অংশ নেই। আর্থিক ভাবে অত্যন্ত অস্বচ্ছল ফরিদ উদ্দিন। জরিমানার একশ প্যাকেট খাদ্য দিতে গিয়ে তাকে বিক্রি করতে হয়েছে স্ত্রীর স্বর্ণের চেইন। সব মিলিয়ে ৭০ হাজার টাকা যোগার করে ১০০ জনের মাঝে চাল, আলু, ডাল, লবন ইত্যাদি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করতে হয়েছে তাকে।

এলাকাবাসী বলেন, ফরিদের আর্থিক অবস্থা খুবই করুণ। কাজ করতে পারেন না। এক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। অন্য মেয়ে টিউশনি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ জোগান। প্রতিবন্ধী ছেলের জন্য নিয়মিত ওষুধ লাগে। তার নিজেরও দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ। দুই চোখেই অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। তিনবার স্ট্রোক করেছেন। কোনো সঞ্চয় নেই তার। নিজের ওষুধ কেনারও পয়সা নেই। ছয় ভাই ও এক বোন মিলে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমিতে চারতলা ভবন করেছেন। চারতলায় উপড়ে টিন শেড দেওয়া দু’টি ঘরে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকেন ফরিদ।

নিজে অসহায় অবস্থায় পড়েছেন বলেই সরকারি সহায়তার জন্য ওই নম্বরে কল করেছিলেন বলে জানান ফরিদ উদ্দিন। তবে, সহায়তা চেয়ে আরও বিপদে পড়েছেন তিনি। ১০০ জনকে খাদ্য সামগ্রী দেওয়ার মতো সামর্থ্য তার নেই। নিজের স্ত্রী ও ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর গয়না বিক্রি ও ধার-দেনা করে বিতরণের জন্য এসব খাদ্যসামগ্রী কিনেছেন বলেও জানান। এমনকি স্থানীয় ইউপি সদস্য আইয়ুব আলীর থেকেও ধার নিয়েছেন ১০ হাজার টাকা।

ফরিদ উদ্দিনের ছোট ভাই শাহীন ও আরেক ভাইয়ের স্ত্রী বিলকিস বেগমও সাংবাদিকদের সামনে বলেন, ফরিদ উদ্দিনের আর্থিক অবস্থা ভালো না। চারতলায় টিনশেডের দু’টো ঘরই তার সম্বল। অথচ তাকে চারতলা বাড়ির মালিক বলে জরিমানা করেছেন ইউএনও।

বিলকিস বলেন, ‘১০০ জনের খাবার কেনার টাকা কই পাবেন আর না দিতে পারলে জেল হবে, এই লজ্জায় শুক্রবার রাতে দুইবার আত্মহত্যা করতেও চেয়েছিলেন আমার ভাসুর। মেয়েটা অবিবাহিত তাই লোকলজ্জার ভয়ে গয়না বিক্রি, ধারনদেনা করে ৭০ হাজার টাকার খাদ্যসামগ্রী কিনেছেন।’

তবে সদর ইউএনও আরিফা জহুরা বলেন, সরকার ৩৩৩ কলসেন্টারের মাধ্যমে অসহায় ও দুঃস্থ মানুষদের খাদ্য সহায়তা প্রদান করছে। কেউ ওই নম্বরে কল করে তাদের সংকটের কথা জানালে উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও অফিসে জানানো হয়। পরে তা যাচাই করে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়। ফরিদ উদ্দিন নামে ওই ব্যক্তিও খাদ্য সহায়তা চেয়ে ওই নম্বরে কল করেন। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ইউপি সদস্য আইয়ুব আলীর মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই ব্যক্তি চারতলা ভবনের মালিক এবং যথেষ্ট স্বচ্ছল।

গতকাল শনিবার খাদ্যসামগ্রী বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন ইউএনও আরিফা জহুরা, সদরের এসিল্যান্ড হাসান বিন আলী, কাশীপুর ইউপি’র ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আইয়ুব আলীসহ স্থানীয় এলাকাবাসী। এ সময় বিতরণ করা প্রতি প্যাকেটে সরকারি সহায়তার মতো ১০ কেজি চাল, ৫ কেজি আলু, ১ কেজি করে ডাল, সয়াবিন তেল, লবন ও পেয়াজ ছিল। এসব খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করার সময় ইউএনও’র সামনে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন ফরিদ উদ্দিন ও তার পরিবারের লোকজন। তারা জানান, ধার-দেনা করে তারা এই খাদ্যসামগ্রী কিনেছেন। তাদের পারিবারিক অবস্থা অস্বচ্ছল ছিল বলেই ৩৩৩ নম্বরে কল করে খাদ্য সহায়তা চেয়েছিলেন। তারা চারতলা ভবনের মালিক না।

উপরে